ভারত ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কৃষক বিদ্রোহ
ফেব্রুয়ারি-মার্চ ২০২৪ ভারতে এবং মার্চ-এপ্রিল’২৪ ইউরোপে ব্যাপক কৃষক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছে। ভারতের ৩টি রাজ্য হরিয়ানা, পাঞ্জাব ও উত্তরপ্রদেশের কৃষকরা প্রধান ভূমিকা রাখলেও সারা ভারতের কৃষক সংগঠনগুলো এতে অংশগ্রহণ করে। ইউরোপের রোমানিয়া, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, জার্মানি, পোল্যান্ড, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, হাঙ্গেরি, স্পেন, গ্রিস ও চেক প্রজাতন্ত্রের কৃষকরা বিদ্রোহ করেছেন। ফ্রান্সে বিদ্রোহ সহিংস রূপ ধারণ করে।
ভারতের কৃষকদের বিদ্রোহ মূলত করোনা চলাকালীন সময়ে বিতর্কিত ৩টি কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে যে বিদ্রোহ হয়েছিল তারই ধারাবাহিকতা। বর্তমান বিদ্রোহে ভারতের কৃষকদের দাবি হচ্ছে কৃষিপণ্যের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি)নির্ধারণ। এমএসপি (মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস) হলো– লাভসহ কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যূনতম দাম বা বাজার মূল্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে কৃষি পণ্যের দাম নির্ধারণ করা। যদি কৃষক ন্যূনতম লাভজনক মূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রি করতে না পারেন তাহলে সরকার এমএসপি দিয়ে কৃষিপণ্যগুলো কিনে নেবে। ভারতে যে কৃষক-বিরোধী ৩টি কৃষি আইন হয়েছিল সেই আইনে ছিল যে, যেকোনো ব্যবসায়ী বা বড় কর্পোরেট কোম্পানিগুলো কৃষকদের কাছ থেকে পণ্য কিনে তা অন্য রাজ্যে বিক্রি করতে পারবে। গত কৃষক আন্দোলনেও আইনের মাধ্যমে এমএসপি'র সরকারি বাধ্যবাধকতা তৈরির একটি দাবিও ছিল। কিন্তু তখন আইনি বাধ্যবাধকতার প্রতিশ্রতি দিলেও গণবিরোধী মোদী সরকার তা রক্ষা করেনি। তাই আবারও পথে নেমেছেন ভারতের কৃষকরা। মূলত কর্পোরেট কোম্পানিগুলো কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে পণ্য কিনে মজুত করে বেশি দামে বিক্রি করবে। ফলে কৃষিপণ্যের বাজারের উপর নিয়ন্ত্রণ আরো বেশি করে চলে যাবে কোম্পানিগুলোর হাতে। তাই ভারতের কৃষকরা চাচ্ছেন পণ্যের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ এবং কৃষিতে কর্পোরেট আধিপত্য বন্ধ।
অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জয় পরাজয়ের অন্যায় প্রতিযোগিতার প্রভাব পড়ছে ইউরোপীয় কৃষকদের উপর। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ইউক্রেন থেকে খাদ্য আমদানিতে কোটা ও শুল্ক প্রত্যাহার করেছে ইইউ। সে কারণে ইউক্রেন থেকে আমদানি করা খাদ্যশস্যের দাম ফ্রান্সের বাজারে কম। সেই দামের সাথে পেরে উঠছেন না ফরাসি কৃষকেরা। রাষ্ট্রের কৃষকবিরোধী বুর্জোয়া ব্যবসায়ীরা বিদেশ থেকে সস্তায় সবজি এনে দেশের বাজারে কম দামে বিক্রি করে কৃষকদের অন্যায় প্রতিযোগিতার মুখে ফেলেছে।
তার উপর রয়েছে পরিবেশ নীতির চাপ। কৃষকদের দাবি, ইইউ’র কৃষকদের যেমন পরিবেশ রক্ষার নীতি মানতে বলা হচ্ছে, তেমনি ইইউ’র বাইরে যে সব দেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে তারাও যেন এ নীতি মানে সেটা নিশ্চিত করা। পরিবেশ নীতির কারণে উৎপাদন খরচে যে বাড়তি অর্থ যোগ হচ্ছে তা বিদেশি কৃষকদের বহন করতে হচ্ছে না। এখানে বৈষম্যমূলক প্রতিযোগিতার শিকার হচ্ছেন ইউরোপের কৃষক। এছাড়া ইউরাপের দেশগুলোতে কৃষক বিদ্রোহের অন্যতম কারণ সেসব দেশের সরকারগুলোর কৃষিখাতে ভর্তুকি কমানো এবং জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির করে কৃষিখাত সমন্বয়ের মিষ্টিকথার আড়ালে কৃষকদের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি করা। এজন্যই ইউরোপের কৃষকরা ফুঁসে উঠেছেন।
বাংলাদেশের কৃষি পণ্যের ব্যবসা মূলত কয়েকটি কপোর্রেট কোম্পানির হাতে বন্দি। চাল, ডাল, তেল, ডিম ইত্যাদি নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের অবা্যহতভাবে মূল্যবৃদ্ধি বর্তমান আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসকগোষ্ঠীর কৃষকস্বার্থ বিরোধী কপোর্রেট কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষার কারণেই ঘটছে। আওয়ামী সরকার কৃষকদের উৎপাদিত ধানের মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও ব্যবসায়ী সিণ্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। এছাড়াও তথাকথিত স্মার্ট কৃষির নামে বেশি মুনাফা লাভের উদ্দেশে কৃষককে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে বাধ্য করছে। ফলে কৃষি জমির উর্বরতা নষ্ট করা হচ্ছে। এভাবে পুরো পৃথিবী জুড়েই সাম্রাজ্যবাদীরা ও তাদের দালাল বড় বুর্জোয়ারা কৃষি ও কৃষককে ধ্বংস করছে।
তাই দুনিয়াজুড়ে এই কৃষক বিদ্রোহ সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদী-পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। এই চলমান সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থা যে শ্রমিক-কৃষকের পক্ষে দাঁড়াতে পারে না, চলমান কৃষক বিদ্রোহগুলো তারও একটা বড় প্রমাণ। সাম্রাজ্যবাদীদের অন্যায় যুদ্ধ এবং তাদের মাঝে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বের কৃষক সমাজের উপর তার প্রভাব পড়েছে। সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা নিপীড়িত দেশগুলোতেও কৃষি ও কৃষকের উপর সাম্রাজ্যবাদী-পঁুজিবাদী আক্রমণ তীব্রতর হচ্ছে। পাশাপাশি এই অন্যায় যুদ্ধ বিপ্লবী যুদ্ধের সুযোগ ও ক্ষেত্র তৈরি করছে। প্রয়োজন হলো কৃষকদের এই মরণপণ বিদ্রোহকে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে এই ব্যবস্থা পরিবর্তনের পরিকল্পিত পথে সংগঠিত করা ও সংগ্রাম গড়ে তোলা।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ভারত ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কৃষক বিদ্রোহ
ফেব্রুয়ারি-মার্চ ২০২৪ ভারতে এবং মার্চ-এপ্রিল’২৪ ইউরোপে ব্যাপক কৃষক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছে। ভারতের ৩টি রাজ্য হরিয়ানা, পাঞ্জাব ও উত্তরপ্রদেশের কৃষকরা প্রধান ভূমিকা রাখলেও সারা ভারতের কৃষক সংগঠনগুলো এতে অংশগ্রহণ করে। ইউরোপের রোমানিয়া, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, জার্মানি, পোল্যান্ড, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, হাঙ্গেরি, স্পেন, গ্রিস ও চেক প্রজাতন্ত্রের কৃষকরা বিদ্রোহ করেছেন। ফ্রান্সে বিদ্রোহ সহিংস রূপ ধারণ করে।
ভারতের কৃষকদের বিদ্রোহ মূলত করোনা চলাকালীন সময়ে বিতর্কিত ৩টি কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে যে বিদ্রোহ হয়েছিল তারই ধারাবাহিকতা। বর্তমান বিদ্রোহে ভারতের কৃষকদের দাবি হচ্ছে কৃষিপণ্যের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি)নির্ধারণ। এমএসপি (মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস) হলো– লাভসহ কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যূনতম দাম বা বাজার মূল্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে কৃষি পণ্যের দাম নির্ধারণ করা। যদি কৃষক ন্যূনতম লাভজনক মূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রি করতে না পারেন তাহলে সরকার এমএসপি দিয়ে কৃষিপণ্যগুলো কিনে নেবে। ভারতে যে কৃষক-বিরোধী ৩টি কৃষি আইন হয়েছিল সেই আইনে ছিল যে, যেকোনো ব্যবসায়ী বা বড় কর্পোরেট কোম্পানিগুলো কৃষকদের কাছ থেকে পণ্য কিনে তা অন্য রাজ্যে বিক্রি করতে পারবে। গত কৃষক আন্দোলনেও আইনের মাধ্যমে এমএসপি'র সরকারি বাধ্যবাধকতা তৈরির একটি দাবিও ছিল। কিন্তু তখন আইনি বাধ্যবাধকতার প্রতিশ্রতি দিলেও গণবিরোধী মোদী সরকার তা রক্ষা করেনি। তাই আবারও পথে নেমেছেন ভারতের কৃষকরা। মূলত কর্পোরেট কোম্পানিগুলো কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে পণ্য কিনে মজুত করে বেশি দামে বিক্রি করবে। ফলে কৃষিপণ্যের বাজারের উপর নিয়ন্ত্রণ আরো বেশি করে চলে যাবে কোম্পানিগুলোর হাতে। তাই ভারতের কৃষকরা চাচ্ছেন পণ্যের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ এবং কৃষিতে কর্পোরেট আধিপত্য বন্ধ।
অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জয় পরাজয়ের অন্যায় প্রতিযোগিতার প্রভাব পড়ছে ইউরোপীয় কৃষকদের উপর। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ইউক্রেন থেকে খাদ্য আমদানিতে কোটা ও শুল্ক প্রত্যাহার করেছে ইইউ। সে কারণে ইউক্রেন থেকে আমদানি করা খাদ্যশস্যের দাম ফ্রান্সের বাজারে কম। সেই দামের সাথে পেরে উঠছেন না ফরাসি কৃষকেরা। রাষ্ট্রের কৃষকবিরোধী বুর্জোয়া ব্যবসায়ীরা বিদেশ থেকে সস্তায় সবজি এনে দেশের বাজারে কম দামে বিক্রি করে কৃষকদের অন্যায় প্রতিযোগিতার মুখে ফেলেছে।
তার উপর রয়েছে পরিবেশ নীতির চাপ। কৃষকদের দাবি, ইইউ’র কৃষকদের যেমন পরিবেশ রক্ষার নীতি মানতে বলা হচ্ছে, তেমনি ইইউ’র বাইরে যে সব দেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে তারাও যেন এ নীতি মানে সেটা নিশ্চিত করা। পরিবেশ নীতির কারণে উৎপাদন খরচে যে বাড়তি অর্থ যোগ হচ্ছে তা বিদেশি কৃষকদের বহন করতে হচ্ছে না। এখানে বৈষম্যমূলক প্রতিযোগিতার শিকার হচ্ছেন ইউরোপের কৃষক। এছাড়া ইউরাপের দেশগুলোতে কৃষক বিদ্রোহের অন্যতম কারণ সেসব দেশের সরকারগুলোর কৃষিখাতে ভর্তুকি কমানো এবং জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির করে কৃষিখাত সমন্বয়ের মিষ্টিকথার আড়ালে কৃষকদের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি করা। এজন্যই ইউরোপের কৃষকরা ফুঁসে উঠেছেন।
বাংলাদেশের কৃষি পণ্যের ব্যবসা মূলত কয়েকটি কপোর্রেট কোম্পানির হাতে বন্দি। চাল, ডাল, তেল, ডিম ইত্যাদি নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের অবা্যহতভাবে মূল্যবৃদ্ধি বর্তমান আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসকগোষ্ঠীর কৃষকস্বার্থ বিরোধী কপোর্রেট কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষার কারণেই ঘটছে। আওয়ামী সরকার কৃষকদের উৎপাদিত ধানের মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও ব্যবসায়ী সিণ্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। এছাড়াও তথাকথিত স্মার্ট কৃষির নামে বেশি মুনাফা লাভের উদ্দেশে কৃষককে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে বাধ্য করছে। ফলে কৃষি জমির উর্বরতা নষ্ট করা হচ্ছে। এভাবে পুরো পৃথিবী জুড়েই সাম্রাজ্যবাদীরা ও তাদের দালাল বড় বুর্জোয়ারা কৃষি ও কৃষককে ধ্বংস করছে।
তাই দুনিয়াজুড়ে এই কৃষক বিদ্রোহ সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদী-পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। এই চলমান সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থা যে শ্রমিক-কৃষকের পক্ষে দাঁড়াতে পারে না, চলমান কৃষক বিদ্রোহগুলো তারও একটা বড় প্রমাণ। সাম্রাজ্যবাদীদের অন্যায় যুদ্ধ এবং তাদের মাঝে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বের কৃষক সমাজের উপর তার প্রভাব পড়েছে। সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা নিপীড়িত দেশগুলোতেও কৃষি ও কৃষকের উপর সাম্রাজ্যবাদী-পঁুজিবাদী আক্রমণ তীব্রতর হচ্ছে। পাশাপাশি এই অন্যায় যুদ্ধ বিপ্লবী যুদ্ধের সুযোগ ও ক্ষেত্র তৈরি করছে। প্রয়োজন হলো কৃষকদের এই মরণপণ বিদ্রোহকে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে এই ব্যবস্থা পরিবর্তনের পরিকল্পিত পথে সংগঠিত করা ও সংগ্রাম গড়ে তোলা।
আরও খবর
- শনি
- রোব
- সোম
- মঙ্গল
- বুধ
- বৃহ
- শুক্র
